উন্নয়নশীল দেশের জন্য উন্মুক্ত এবং ফ্রি সফটওয়্যার

উন্মুক্ত বা মুক্ত সফটওয়্যার বা ওপেন সোর্স সফটওয়্যার এবং ফ্রি সফটওয়্যার যা আজকে ডিজিটাল জগতে একটি মুখ্য বিষয়। উন্মুক্ত সফটওয়্যার এখন আর শুধু সফটওয়্যার কোন ধরন নয় আজ এটি একটি আন্দোলোন। আসুন আগে জানি কি এই উন্মুক্ত সফটওয়্যার এবং ফ্রি সফটওয়্যার।

উন্মুক্ত সফটওয়্যার
আমরা অনেকেই সফটওয়্য়ার সম্পর্কে জানি। সফটওয়্যার এক বা একাধিক পোগ্রাম যা একজন কম্পিউটার ব্যবহারকারীকে তার বিভিন্ন কাজ করতে সহায়তা করে। যেমন: অপারেটিং সিস্টেম, ইন্টারনেট ব্রাউস করার জন্য ফায়ারফক্স, গান শুনার জন্য ভিএলসি, বাংলা লেখার জন্য অভ্র ইত্যাদি। একটি সফটওয়্যার এর পিছনে অনেক গুলো কোড বা সংকেত থাকে যা একসময়ে সাধারন মানুষের বোঝার ক্ষমতার বাইরে ছিলো, কিন্তু প্রযুক্তির উন্নয়ে এখন মানুষ তা সহজেই বুঝতে পারে। আর একটি সফটওয়্যার সোর্স কোড বা এর সংকেত যখন কোন ব্যবহারকারীর নিকট উন্মুক্ত করে দেওয়া হবে তখনই এটিকে উন্মুক্ত বা মুক্ত সফটওয়্যার বলা হবে। আমরা জানি জ্ঞান বাড়লে তা বৃদ্ধি পায়, এই ধারনা থেকেই মুক্ত সফটওয়্যার আন্দোলনের জন্ম। মুক্ত সফটওয়্যারের মূল কথাই হল মেধাসত্ত্বঃ কারও কুক্ষিগত সম্পদ নয়। এটি সকলের জন্য উন্মুক্ত হতে হবে।

 

ফ্রি সফটওয়্যার

ফ্রি মানে মাগনা না। আমরা অনেকেই ফ্রি সফটওয়্যার এর নাম শুনলেই মনে করি মাগনা সফটওয়্যার এর বা কি থাকবে। সস্তার তিন অবস্থ্যা আমরা সকলেই জানি। তবে কম্পিউটার জগতে ফ্রি অর্থ স্বাধীনতা। ফ্রি অর্থ হচ্ছে আমার ব্যবহারের স্বাধীনতা। আমি যেটা চাইবো আমি ব্যবহার করতে পারবো। নিজের ইচ্ছা অনুযায়ী তা পরিবর্তন এবং পরিবর্ধন করে আমার পরিচিতদের দিতে পারবো (তবে এক্ষেত্রে কপি লেফট লাইসেন্স এর কিছু কথা আছে। যেখানে মূলত বলা থাকে আমনি এই সফটওয়্যার এর যে মূল পোগ্রামার তার নাম বা কৃতিত্ব স্বিকার করবেন)। আমরা ফ্রি সফটওয়্যার টাকা দিয়ে কিনেও চালাতে পারি অথবা তা বিনামূল্যেও পেতে পারি। কিন্তু আমরা এর সাথে এর কোড বা সংকেত পাবো।

ফ্রি সফটওয়্যার হল এমন এক ধরনের সফটওয়্যার যা ব্যবহার, অধ্যয়ন এবং সম্পাদনা করার ক্ষেত্রে কোনো ধরনের বাধা নিষেধ নেই। এমনকি এই সফটওয়্যার গুলি কপি বা বিতরণ করার জন্যও একই নিয়ম প্রযোজ্য হবে, এবং বিতরণের কপিটি হতে পারে সফটওয়্যারটির মূল সংস্করণ বা পরিবর্তীত কোন সংস্করন। কোনো কোনো বিশেষ ক্ষেত্রে এই সফটওয়্যারগুলি বিতরণের ক্ষেত্রে কিছু বিধি-নিষেধ আরোপ করা হয় যেন গ্রহীতারা সফটওয়্যার ব্যবহার বা পরিবর্তন করার একই ধরনের সুবিধা পায়। ফ্রি সফটওয়্যার সমূহ সাধারণত বিনামূল্যে পাওয়া যায়, তবে ক্ষেত্র বিশেষে মূল্য পরিশোধ করতে হতে পারে। যেমন সফটওয়্যারটি সিডিতে বিতরণ করা হলে সিডি তৈরীর মূল্যের বিনিময়ে সফটওয়্যারটি গ্রহন করতে হতে পারে।[২]

উন্মুক্ত সফটওয়্যারের বিপরীত হল ক্লোজ সোর্স সফটওয়্যার। যখানে একজন সাধারন ব্যবহারকারী জানতে পারে না তিনি যে সফটওয়্যারটি ব্যবহার করছেন তার পিছনে তার জন্য কোন ক্ষতিকর কিছু লেখা আছে কিনা? যা একটি উন্মুক্ত সফটওয়্যার এ জানা সম্ভব। কারন এর কোড না সংকত সকলের জন্য উন্মুক্ত। আর ফ্রি সফটওয়্যারের বিপরীত হলো প্রপাইটরি সফটওয়্যার।

উন্নয়নশীল দেশের জন্য উন্মুক্ত সফটওয়্যারএবং ফ্রি সফটওয়্যার
আগেই বলেছি ওপেন সোর্স মানে সফটওয়্যার সোর্স সকলের জন্য উন্মুক্ত থাকবে এবং ফ্রি সফটওয়্যার এর সকলের জন্য কিছু সুযোগ সুবিধা দেয়। তাহলে কিভাবে এই উন্মুক্ত সোর্স একটি উন্নয়নশীল দেশের উন্নয়নে সহযোগীতা করতে পারে?

প্রযুক্তি ব্যবহারের স্বাধীনতা

উন্মুক্ত এবং ফ্রি সফটওয়্যার ব্যবহারের প্রধান সুবিধা হলো ব্যবহারের স্বাধীনতা। আপনি চাইলে একটি ফ্রি এবং উন্মুক্ত সফটওয়্যারকে যে কোন কাজে ব্যবহার করতে পারেন, যা আপনি প্রপাইটরি সফটওয়্যারের ক্ষেত্রে পারবেন না। আপনি ইচ্ছা করলেই লিব্রে অফিস কে উইন্ডোজ বা ম্যাক অপারেটিং সিস্টেমে চালাতে পারবেন। কিন্তু মাইক্রোসফ অফিসকে একমাত্র মাইক্রোসফট অপারেটিং সিস্টেমেই চালাতে হয়।

তথ্যের সুরক্ষা

একটি দেশকে উন্নত করতে হলে চিন্তা করতে হয় কিভাবে তার ক্রমবর্ধমান তথ্য কে চুরি হওয়া থেকে রক্ষা করা যায়। প্রযুক্তির যুগে এখন সবাই প্রযুক্তি ব্যবহার করেই নিজেদের তথ্য সুরক্ষা করতে চাইবে। আর আমরা যদি উন্মুক্ত বা ফ্রি প্রযুক্তি ব্যবহার না করে কোন প্রপাইটরি প্রযুক্তি ব্যবহার করি তাহলে আমাদের তথ্য সুরক্ষা নিয়ে একটি প্রশ্ন থাকে। যেমন: আপনি আমি বা কেউই জানি না একটি প্রপাইটরি সফটওয়্যারের পিছনে কি কোড বা সংকেত লেখা আছে। যা আপনার তথ্য কে চুরি করে নিয়ে যেতে পারবে এ সম্পর্কে কেউ নিশ্চয়তা দিতে পারবে না। যেখানে ফ্রি এবং উন্মুক্ত সফটওয়্যার ব্যবহার করলে আপনি এই নিশ্চয়তা পাবেন যে এটি আপনার কোন ক্ষতি করছে না।

প্রযুক্তির দ্রুত উন্নয়ন

ফ্রি এবং উন্মুক্ত সফটওয়্যার সহজেই পরিবর্তন এবং পরিমার্জন করা যায়। এতে একটি দেশের প্রযুক্তির দ্রুত উন্নয়ন ঘটানো যায়। যেমন: লিনাক্স একটি ফ্রি এবং উন্মুক্ত প্রযুক্তি। এই লিনাক্স কে ব্যবহার করে পৃথীবিতে তৈরি হচ্ছে অনেক অপারেটিং সিস্টেম। একটি উন্নয়নশীল দেশ ইচ্ছা করলেই এই প্রযুক্তিকে ব্যবহার করে নিজেদের জন্য তৈরি করতে পারে একটি অপারেটিং সিস্টেম। যার ফলে নতুন করে লিনাক্সের মতন কিছু তৈরি করার পিছনে যে সময় ব্যয় হতো তা বেঁচে গেলো।

অনুবাদ

একটি উন্নয়নশীল দেশকে শুধু তার শহুরে বা যারা ইংরেজি ভাষা জানে তাদের কথা চিন্তা করলেই চলে না। তাদের চিন্তা করতে হয় যারা ইংরেজি ভাষা জানে না বা জানার সুযোগ পায় না তাদেরকেও। আর প্রযক্তির ব্যবহার করেই উন্নত হতে হবে। কিন্তু প্রায় সকল প্রপাইটরি সফটওয়্যারই শুধু ইংরেজি ভাষায় তেরি করা হয়ে থাকে। কিছু বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে অন্য ভাষায় তা পাওয়া যায়। কিন্তু উন্মুক্ত এবং ফ্রি সফটওয়্যার ব্যবহার করলে আমরা যে সুবিধা পাবো তাহল নিজের ভাষায় সেই সফটওয়্যার কে অনুবাদ করে নেওয়া। এতে সফটওয়্যারটি সকলের কাছেই গ্রহনযোগ্য হয়ে উঠবে।

বৈদেশিক ব্যয় হ্রাস

দেখা যায় প্রায় সকল প্রপাইটরি সফটওয়্যারই টাকা দিয়ে কিনে নিতে হয়। এতে করে একটি উন্নয়নশীল দেশের বৈদেশিক ব্যয় বৃদ্ধি পায়। যেমন: মাইক্রোসফট উইন্ডোজ। একটি নতুন কম্পিউটার এর সাথে একটি উইন্ডোজ অপারেটিং সিস্টেম কিনতে হলে প্রায় ৫০০০ টাকা বেশি দিতে হয়। আর এই টাকার প্রায় সিংহ ভাগই যায় বিদেশে। আমাদের দেশে এর কিছুই থাকে না। কিন্তু আমরা যদি ফ্রি এবং উন্মুক্ত অপারেটিং সিস্টেম যেমন উবুন্টু চালাই তাহলে আমাদের কোন টাকাই ব্যয় করতে হবে না এই অপারেটিং সিস্টেমের পিছনে। এরকম আরও অনেল প্রপাইটরি সফটওয়্যার আছে যা আমাদের কিনে ব্যবহার করতে হয়। যার জন্য একটি উন্নয়নশীল দেশের অনেক বৈদেশিক ব্যয় বৃদ্ধি পায়। এর পরিবর্তে যদি ফ্রি এবং উনমুক্ত সফটওয়্যার ব্যবহার করা হয় তাহলে এই ব্যয় টা হ্রাস পাবে এবং এটি অন্য খাতে ব্যয় করা যাবে।

প্রযুক্তি উন্নয়ন খরচ হ্রাস

একটি সফটওয়্যার ফ্রি হলে তা আমরা সহজেই নিজের প্রয়োজনে সংযোজন এবং বিয়োজন করতে পারবো। যেমনটি করা যায় মোজিলা ফায়ারফক্সে। আমরা ইচ্ছা করলেই ফায়ারফক্সে অনেক কিছু যোগ করতে পারি বা বিয়োগ করতে পারি, যেমন আপনি আপনার নাম দিতে পারবেন ফায়ারফক্সের পরিবর্তে। এতে যে সুবিধা হয় তাহল আমাদের নতুন করে কোন কিছু তৈরি করতে হচ্ছে না, শুধু যেটা আছে সেটাকে কিছুটা পরিবর্তন করে আমরা ব্যবহার করতে পারব। এতে করে প্রযুক্তি উন্নয়ন খরপ কিছুটা হ্রাস পাবে।

সহযোগীতা এবং ব্যবহারবান্ধবতা

একটি উন্মুক্ত এবং ফ্রি সফটওয়্যার তৈরি করা জন্য অনেকেই কাজ করে থাকেন। যা একটি প্রাপাইটরি সফটওয়্যারের ক্ষেত্রে সম্ভব হয় না। একসাথে অনেকে কাজ করে এবং ব্যবহার করে বলে এর সহযোগীতা পাওয়া অনেক সহজ হয়। এই সকল সফটওয়্যার আপনি আপনার মতন করে তৈরি করে নেওয়ার সুযোগ পাবেন, তাই এটি অনেকটাই ব্যবহারবান্ধব হবে। এর ফলে প্রযুক্তির ব্যবহার আরও বাড়বে, যত ব্যবহার বাড়বে দেশ তত এগিয়ে যাবে।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s